March 17, 2026, 1:26 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ক্রমেই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। গত ১৫ মাসে নতুন করে আরও ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জনে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিগত ইউনুস সরকার কার্যত দুই দিকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। একদিকে সীমান্ত দিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াতেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে সংকট দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নতুন আগত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জনে। জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে ১ হাজার ১২৯ জন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে মোট ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ২০১৭ সালের গণহত্যার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের নিজ দেশে ফেরানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং একটি বড় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় জনগণের ওপর চাপ বাড়ছে, বনভূমি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন নীতি বিশ্লেষকরা। কিন্তু তাদের অভিযোগ, ইউনুস সরকার এখন পর্যন্ত সেই ধরনের দৃঢ় কূটনৈতিক তৎপরতা দেখাতে পারেনি। ফলে মিয়ানমারের ওপর প্রত্যাবাসনের চাপও তৈরি হয়নি।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে এখনো রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তার খোঁজে তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউএনএইচসিআর ১০ লাখ ৪০ হাজার ৪০৮ জন রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে, যারা বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৫০২ জন ১৯৯০ সালের পর এবং ১০ লাখ ৯০৬ জন ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশই নারী ও শিশু। এছাড়া প্রায় ১২ শতাংশ বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ, যেমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সঙ্গীহীন শিশু, গুরুতর অসুস্থ রোগী ও বয়স্ক মানুষ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে কোনো অগ্রগতি নেই বলেই মনে করছেন তারা।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি ক্রমেই একটি স্থায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী।